জানা অজানায় জন্ম শতবর্ষে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) : - বিকাশবাংলা - Bikash Bangla

সরকারি চাকরি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, রান্নার রেসিপি, সাস্থের খবর, খবর, latest news, new job news, cooking recipe, online income, blogging tutorial, health tips

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

জানা অজানায় জন্ম শতবর্ষে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) :

জানা অজানায় জন্ম শতবর্ষে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay)

গত শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকে রুশ বিপ্লব এমনই এক আশা জাগিয়েছিল যে, পুরনো ছাঁচে-আঁটা সমাজের জায়গা নেবে এক নতুন সমাজ, যেখানে প্রতিটি মানুষেরই স্বাধীন বিকাশ হবে। তেমন আশা থেকেই সম্ভবত বিপ্লবের তিন বছর পর ১৯২০-সালে যখন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) ঢাকা শহরে জন্মগ্রহন করলেন, দাদামশাই যোগেন্দ্র চট্টরাজ তাঁর নাম রাখলেন: সাম্যময়

সরকারি বারণ না শোনায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay)- এর  দাদামশাইয়ের একটি বই তদানীন্তন ব্রিটিশ শাসক নিষিদ্ধ করে দেয়। ভানু বাবুর মাতৃদেবীও ইংরেজ-শাসনের তোয়াক্কা না করে এক পুলিশ ও মেমসাহেবকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন তাঁদের অভব্য আচরণের প্রতিবাদে। প্রতিবাদের এই মনটাই  ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন পারিবারিক উত্তরাধিকারে।

ছেলেবেলা থেকেই তাই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) এর ভয়ডর তেমন ছিল না বললেই চলে। একটা বেপরোয়া বোহেমিয়ান স্বভাব আস্তে আস্তে শিকড় গেঁথেছিল তাঁর মধ্যে। সেই স্বভাবই তাঁকে মানে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কে রাষ্ট্রের শাসকদৃষ্টি চিনতে শিখিয়েছিল, শিখিয়েছিল কমেডি অভিনয়ের ভিতর দিয়ে কী ভাবে সমাজের পুরনো চালু ছাঁচ ভেঙে চুরমার করে ব্যক্তির স্বাধীন বিকাশের সম্ভাবনাকে ক্রমপ্রসারিত করা যেতে পারে। দেশবোধ তাঁর সারা জীবনের দৈনন্দিনতায় জড়িয়ে গিয়েছিল।

Bhanu Bandopadhyay the legendary comidian at 100 years

সারা জীবন, যখনই অভিনয় করেছেন সিনেমায় নাটকে কিংবা যাত্রায়, একই সঙ্গে যখন অভিনেতা, নির্দেশক, উপদেষ্টা, এমনকি প্রযোজকও হয়ে উঠেছেন, দেশব্রতী থেকেছেন, সপ্রশ্ন থেকেছেন স্বাধীন দেশের শাসক সম্পর্কে, অবিরত দেশের নানা সমস্যা, যা সামাজিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে, তা নিয়ে ইঙ্গিতবাহী কৌতুকের মাধ্যমে অবহিত করেছেন সরকারকে। 

‘দৃষ্টিভঙ্গিতে সচেতন করার জন্যে সমাজকে ও সাধারণ মানুষকে খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে’ দিতেও চেয়েছেন: "আমি মানুষের পক্ষে কথা বলতে চাই, সেটা রাজনৈতিক হতেই পারে।”

ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay)। ১৯৪১-এ চলে আসেন কলকাতায়। ঢাকায় ব্রিটিশ-বিরোধী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে পালাতেই হয়েছিল বৃদ্ধ বাবা-মার কথা ভেবে, কারণ ইংরেজ সরকার তাঁর নামে ওয়ারেন্ট বার করেছিল।

বাল্যবন্ধু গোপাল মিয়া সপরিবার কলকাতায় আসছিলেন গাড়িতে চেপে, তার পিছনের সিটের পাদানিতে শুয়ে রওনা হন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) লিখেছেন-
“ভীষণই রোগা হওয়াতে বিশেষ অসুবিধা হল না।” 
সঙ্কটকালেও নিজের চেহারা নিয়ে এমন ঠাট্টা করতে পারতেন তিনি, এটা তাঁর বরাবরের স্বভাব।

কলকাতায় আসার বছর পাঁচেক পর ১৯৪৬ সালে যখন একই সঙ্গে বিয়ে ও প্রথম ছবির শুটিং করছেন, এ শহর তখন দাঙ্গার কবলে। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) এর চেহারা দেখে পরিচালক বলেছিলেন, “আমার ছবিতে দুর্ভিক্ষপীড়িত চিমসে চেহারার একটা চরিত্র আছে, সেটা তুমি করবে।”

সেই প্রসঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) লিখছেন,- 
"দুর্ভিক্ষপীড়িত চরিত্র বলে শুটিংয়ে “লজ্জা নিবারণের জন্য একটা চট পরে আছি দড়ি দিয়ে বেঁধে। আর আমার শ্বশুর হতবাক তাঁর সদ্যবিবাহিত মেয়ের স্বামীর এরকম সঙের মতো সাজ, মেকাপ দেখে।”

একমাত্র বড় কোনও অভিনেতাই পারেন চার পাশের অস্থির সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে নিজেকে এ ভাবে ঠাট্টার পাত্র করে তুলতে। আসলে তিনি তো দেখতে পাচ্ছেন, সম্ভাব্য বাস্তব তাঁর সামনে ক্রমাগত ধ্বস্ত। তার জায়গায় জেগে উঠছে নতুন এক বাস্তব, যা ভয়ঙ্কর হলেও সত্য, অনভিপ্রেত বা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য। সমাজের অসঙ্গতির সেই সত্যকেই ব্যঙ্গকৌতুকে মুড়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দুরূহ কাজটি করেন কোনও সৎ শিল্পী।

তেমনটাই করতেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay)। 
“কৌতুকাভিনয় আমাকে সামাজিক কর্তব্য পালন করতে সাহায্য করে। আমার বিচারে সমাজে কমেডিয়ানদের একটা বিশেষ অস্তিত্ব এবং দায়িত্ব আছে।... বীরবল মোগল দরবারে শ্রেষ্ঠ চেতনাসম্পন্ন চরিত্র, তাঁর কাজ ছিল সম্রাটকে প্রয়োজনানুসারে চেতনা-সমৃদ্ধ করে তোলা। গোপাল ভাঁড় তো মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বিবেকের মতো।... তাঁদের মাধ্যম নিশ্চয়ই কৌতুক, কিন্তু কখনওই নিছক কৌতুক সৃষ্টি নয়।”

কৌতুক যে কেবল অহেতুকের খেলা নয়, ছেলেবেলাতেই তা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) এর মনের মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়েছিল বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের সান্নিধ্যে এসে। “ওঁর প্রভাবে প্রবল ভাবে দেশভক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম,” লিখেছেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। ভানুকে তিনি খুদে গোয়েন্দার কাজ দিয়েছিলেন, ব্রিটিশ সরকারের পুলিশের উপর নজরদারি করার। তখনই ভানুকে কমেডির প্রতি আকৃষ্ট করে তুলছিল ঢাকার গরুর গাড়ির গাড়োয়ানের দল, তাঁরা ছিলেন বালক ভানুর গোয়েন্দাগিরির সঙ্গী। 
তাঁদের সাঙ্ঘাতিক ‘সেন্স অব হিউমার’ আর ‘উইট’ কমেডির জগতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কে: “আমার কমেডিয়ান হয়ে ওঠার পিছনে এদের প্রচুর অবদান ছিল।”

ঢাকাই গাড়োয়ানদের সঙ্গে বসে ওই সময়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) রপ্ত করেছিলেন তাঁদের কুট্টি ভাষা ও কৌতুক। তা থেকে তৈরি করতেন নিজস্ব কমিক স্কেচ, শুরুতে অসুবিধা হলেও কলকাতাবাসী ক্রমশ সড়গড় হয়ে উঠলেন ভানুর ঢাকাই বাঙাল কৌতুক নকশায়।

কৌতুক-কাহিনি কথনের এই যে দেশজ ধরন, বলার ধরনের সঙ্গে সঙ্গে তার কাহিনিগুলোও বদলে-বদলে যেত, যেন এক দেশীয় আঙ্গিকের ভেতর নিজের কাহিনিটা ঢুকিয়ে সমকালীনতা সঞ্চার করতেন, অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে দিতেন ভানু। 

ঔপনিবেশিকতার শিক্ষা-সংস্কৃতির ফাঁক গলে অভিনয়ে স্বাদেশিকতার নতুন ধরন নিয়ে এলেন আত্মপ্রত্যয়ী ভানু: “এই বাচনভঙ্গির সঙ্গে আমার ইনবর্ন উইট আর অসংশোধনীয় বাঙালত্ব যোগ হয়ে যে সমীকরণ সৃষ্টি হল, তা-ই আজকের আমি।”

সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে ছিলেন বলেই বোধ হয় তাঁকে বুঝতে বা চিনতে তাঁর শতবর্ষ (জন্ম ২৬ অগস্ট ১৯২০) অবধি অপেক্ষা করতে হল আমাদের। কতখানি এগিয়ে ছিলেন, তা তাঁর একটি কৌতুক-নকশা ‘ভানুশ্বরানন্দ’ থেকে নমুনা নেওয়া যাক: 
“জগতের নিয়ম বিস্তর পালটাইছে। সব কিছু বেশি কইরা পাইতে হইলে অখন একমাত্তর এই গেরুয়া লাইনটাই খোলা। ভারতবর্ষের যেইখানেই যাও গেরুয়ার মাইর নাই, আয়কর নাই, পৌরসংস্থার ঝামেলা নাই, লোডশেডিং-এর বালাই নাই।”

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম: ২৬ আগস্ট, ১৯২০ - মৃত্যু: ৪ মার্চ, ১৯৮৩) 

ঋণ: ভানু সমগ্র (পত্রভারতী),  এবং আনন্দবাজার পত্রিকা
ইমেল-এ সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার জন্য প্রবন্ধ পাঠানোর ঠিকানা: bikashbangla2020@gmail.com
অনুগ্রহ করে সঙ্গে ফোন নম্বর জানাবেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

MAIN MENU